29 July, 2021 (Thursday)
শিরোনাম

জাদুকর অমর আছেন, তার জাদুরা বেঁচে আছে

প্রকাশিতঃ 19-07-2021



নিউজ প্রতিবেদক : তিনি ছিলেন হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালা। ঘর থেকে ছন্নছাড়াদের বের করে আনতে তার বাঁশি ছিল দুই মলাটের মাঝে আবদ্ধ কিছু পাতা। প্রথম পাতা থেকেই ছড়াতে শুরু করতো মুগ্ধতা। শেষ পাতা পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো পাঠকদের। আর বইটা বন্ধ করার পর সে জাদু কাটতে অনেকদিন সময় কেটে যেতো। কিংবা কখনও কাটতোই না।

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এমনই একজন জাদুকর, যার জাদু কখনও শেষ হবার নয়। কখনও ভোলার নয়। এই জাদুতে মানুষ আচ্ছন্ন হতে চায় বারবার।

আহমদ ছফার উদ্যোগে শুরুটা হয়েছিল নন্দিত নরকের মাধ্যমে। ছফা রত্নটিতে চিনতে একেবারেই ভুল করেননি।  প্রথম বইতেই নিজের জাত চিনিয়ে দেবার মতো লেখক হয়ত খুব একটা পাওয়া যাবে না, কিন্তু তা ধরে রাখা? চাট্টিখানি কথা নয়। কেবল সাহিত্য নয়, শিল্পের এমন কোনো স্তর নেই, যেখানে হুমায়ূন তার তুলির স্পর্শ বোলাননি। উপন্যাস থেকে শুরু করেছেন। এরপর নাটক, চলচ্চিত্র, গান লেখা এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেননি। নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজের রুঢ় বাস্তবতা আসলে কেমন হয়, কতটা নির্মম হয়, তা হুমায়ূন বেশ ভালো করেই জানতেন। আর তা জানতেন বলেই শহুরে আটপৌরে জীবন তার কলমে ফুটে উঠেছে সাবলীল কিন্তু অত্যন্ত বোল্ডভাবে।

সমাজ, রাজনীতি, ঘটে যাওয়া নানা অসঙ্গতি ইত্যাদি নানা বিষয়গুলো স্যাটায়ারের মাধ্যমে তুলে ধরতে তার কোনো জুড়ি ছিল না। যেখানে “কী হচ্ছে”, তা বোঝাতে সাহিত্যিকদের বেশ বেগ পেতে হয়, সেখানে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একদম অকপট। তার ভাষা ছিল অত্যন্ত সরল এবং প্রাঞ্জল। ছোট থেকে বড়, যে কোনো চরিত্রকেই তিনি সমানভাবে মনোযোগ দিতেন। তার অমর কিছু চরিত্র আছে, যেগুলো এখনও মানুষ লাইন ধরে কেনে।

হিমুর মতো একজন চরিত্রকে কী ভোলা যায়? একজন সাহিত্যিকের সৃষ্ট চরিত্র যখন তাকে ছাপিয়ে যায়, সেখানেই তো তার সার্থকতা। এমন কোনো যুবক পাওয়া যাবে, যে হিমুকে পড়ে একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায়নি? রাত-বিরাতে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটেনি? কিংবা হলুদ পাঞ্জাবি পরে রাস্তায় হাঁটেনি?

মাটির মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে জোছনার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকার মতো উদ্ভট বিলাস তো হুমায়ূনের চরিত্রকেই শোভা পায়। কিন্তু ব্যাপারটা কত স্বাভাবিক করে দিয়েছেন লেখক! ভাবলে মনে হয়, নাহ! জোছনা তো এভাবেই দেখা উচিত। এমনটাই তো হওয়া উচিত। একজন রূপার মাধ্যমে নীল শাড়ি আর কীভাবে ছন্নছাড়াদের ভালোবাসতে হয়, তা তো হুমায়ূনই শিখিয়ে গেছেন।

কিংবা মিসির আলি? সংসারহীন এই মানুষটি যখন যুক্তির শাণ দেয়া ছুরিতে একের পর রহস্য ভেদ করতে শুরু করেন, পাঠকদের অবাক না হয়ে উপায় আছে? আবার এই মিসির আলির মাঝেই হুমায়ূন এঁকেছেন এক মানবিক রূপ। হাসপাতালে পড়ে থাকবার সময় মিসির আলি যখন বন্ধুর হাতে কিছু টাকা দিয়ে পাশের বেডের সকাল থেকে না খাওয়া ছেলের হাতে গুঁজে দিয়ে আসতে বলেন, পাঠকদের চোখ না ভিজে কি কোনো উপায় আছে? আবার এই মিসির আলিই একের পর এক যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের দর্পের দেয়াল ভাঙতে শুরু করেন। দিনশেষে

অন্যভুবন গল্পে হুমায়ূন আহমেদ তাকে একজন অসহায় মানুষ হিসেবেই দেখিয়েছেন, যার প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সামর্থ্য নেই।

আচ্ছা, এসব চরিত্রের ছাপ যদি নিজের মধ্যে না থাকে, একজন লেখক কি স্রেফ মনগড়া কল্পনার রাজ্যে বাস করতে করতেই তা লিখতে শুরু করেন? আমার কিন্তু তা মোটেই মনে হয় না। বাস্তবের হুমায়ূন আহমেদ বরং তার হিমুর চাইতেও বেশি হিমু, মিসির আলির চাইতেও বেশি লজিক্যাল।

মীরু, নীরা, শাহানা এসব সাধারণ তরুণীদের কেমন করে অসাধারণ করে গড়ে তুলতে হয়, তা মিসির আলির চেয়ে ভালো আর কে জানে? তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে উপন্যাসে যখন আমরা দেখতে পাই ছোট বোনের হবু দুলাভাই তার টানেই চলে আসে পথ পাড়ি দিয়ে, উপন্যাসের শেষে দেখা যায় বড়বোনকে বুকে আগলে ধরে ছোটবোন ক্রমাগত সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে, পাঠকের মনে যদি আলোড়ন তৈরি না হয়, তাহলে একজন সাহিত্যিকের সার্থকতা কোথায়?

কিংবা কানাবাবা? শুভ্রের মতো একজন শুভ্র চরিত্র বাংলা সাহিত্যে আর আছে? ক্ষমতাধর বাবার ছায়ায় নিজেকে আটকে না রেখে যে প্রস্ফুটিত হতে চায় নিজের মতো করেই? মায়ের সহযোগিতা আর সহমর্মিতা তার পাশে থাকে সবসময়। আর বিনুর ভালোবাসা থাকে গড়ে তোলে শুদ্ধ একজন মানুষ হিসেবে, যেভাবে আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়।

ভৌতিক গল্প হলেও কুটু মিয়ার মতো পাচক হতে চেয়েছিল কেউ কেউ। চমৎকার সব রসনার বাহারি আয়োজন তো হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন জাদুকরের হাত ধরেই বের হবে। তাই নয় কি? গল্পটা শেষ করে কুটু মিয়ার জন্যই বরং কিছুটা দুঃখ দুঃখ অনুভূত হয় পাঠকের।

আবার ছবি নির্মাণেও হুমায়ূন আহমেদের দক্ষতা ছিল অসামান্য। কেবল গল্প আর অভিনয়ের মাধ্যমেই যে ছবিকে প্রাণ দেয়া যেতে পারে, তা তার চেয়ে ভালো আর কে জানবে? শ্রাবণমেঘের দিন, শ্যামল ছায়া, আগুনের পরশমণি, ঘেঁটুপুত্র কমলা ইত্যাদি ছবিগুলোর মাধ্যমে হুমায়ূন যেন বেথোভেনের চেয়েও আশ্চর্য কিছু সিম্ফোনি রচনা করেছেন। যতবারই ছবিগুলো দেখবেন, নিজেকে ক্লান্ত মনে হবে না। 

বাকের ভাইয়ের মতো একটি চরিত্রের মাধ্যমে জনগণকে রাস্তায় নামিয়ে আনার মতো সাহিত্যিক বাংলাদেশে তো একজনই আছেন! এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত তাকে কল করে অনুরোধ করেছিলেন চরিত্রটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় কিনা। অনড় ছিলেন হুমায়ূন। স্রষ্টা তার সৃষ্টিকে ধ্বংস করতেই পারেন। এখানে কারও এখতিয়ার নেই।

বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে বড়চাচা, ছোটচাচা, দাদী নানীর মতো চরিত্রগুলোকে কেমন করে বাঁচিয়ে রাখা যায়, জনপ্রিয় করে তোলা যায়, তা হুমায়ূন আহমেদ তার ক্যারিশম্যাটিক উপায়ে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। প্রেমের উপন্যাসগুলোতে লিখে গিয়েছেন প্রেম কখনও সমান্তরাল হয়, আবার নানা দিকে বাঁক নিতে পারে। চরিত্র তো আসলে একটা দুটো নির্মাণ করেননি হুমায়ূন। বাংলাদেশের আধুনিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রণেতা তো হুমায়ূনই। রচনা করেছেন ফিহার মতো একটি চরিত্র। এমনকি জীবনের শেষবেলায় রচনা করে গিয়েছেন বাদশাহ নামদারের মতো একটি বই, যেটি পড়ার পর পাঠকেরা চমকে উঠেছেন। আরে! ইতিহাসও যে এভাবে লেখা যায়, তা তো

জানা ছিল না! আবার একটু পর ভেবে আশ্বস্ত হতে হয়। না ঠিকই তো আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চিত্র কতটা সুনিপুণভাবে সমাজের সামনে তুলে ধরা যায়, তা হুমায়ূনের চেয়ে ভালো বোধ করি আর কেউ করতে পারেননি।

সিরাত গ্রন্থ লেখার কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। শেষ করতে পারলে এই দেশের সাহিত্য সমাজ হয়ত মহানবী (স:)-কে নতুনভাবে চিনতে পারতো। কিন্তু তার আগেই তো প্রয়াণ ঘটলো এই জাদুকরের।

আজ ১৯শে জুলাই। নয়টি বছর হয়ে গেলো হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মাঝে আর নেই। বইমেলা হলে এখনও তার বই বেস্টসেলার তালিকায় থাকে। টেলিভিশনের পর্দায় তার নাম উচ্চারিত হলেই কাজ ফেলে ছুটে যায় সবাই। এত মন্ত্রমুগ্ধের মতো আর কে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশকে?

নাহ! জাদুকরের আসলে মৃত্যু হয়নি। মৃত্যু হয়নি তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোও। এগুলো বাঁচিয়ে রাখব আমরা।

বাঁচিয়ে রাখব জাদুকরকে বুকের সঙ্গোপনে, অতি যতনে।




Social Media

মন্তব্য করুন:





সর্বশেষ খবর





সর্বাধিক পঠিত



এই বিভাগের আরও খবর

আরও সংবাদ