25 September, 2021 (Saturday)
শিরোনাম

ভুটান: করোনা টিকাদানে নিভৃতেই বাজিমাত করা এক দেশের নাম

প্রকাশিতঃ 31-07-2021



অনলাইন ডেস্ক : জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে মিনিমালিজম খুবই চমৎকার একটি টার্ম। আর যারা মিনিমাল একটি জীবন পরিচালনা করে তাদেরকে বলা হয় মিনিমালিস্ট। হয়ত অনেকেই কথাটি শুনে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকাবেন। মিনিমালিস্ট জীবন আদর্শ হিসেবে নেয়া আজকের দুনিয়ায় রীতিমতো কষ্টকল্প। মিনিমালিস্ট জীবন আসলে কী? এর মানে হচ্ছে, একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যতীত বাহুল্য সম্পদ বা দ্রব্য বর্জন করে মানিয়ে নেয়া এক জীবন। অর্থাৎ, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় সবকিছুকে বিদায়।

ভারতীয় উপমহাদেশের হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে অবস্থিত এই দেশটিকে বলা হয় দ্রুক ইয়ুল বা বজ্র ড্রাগনের দেশ। এশিয়ার সুইজারল্যান্ড হিসেবে খ্যাতেই পাহাড়েঘেরা দেশটির আয়তন মাত্র ৪৬,৫০০ বর্গকিলোমিটার। মালদ্বীপের পর এটিই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ছোট্ট এই দেশটির শিল্প খাত এখনও অনুন্নত পর্যায়ে রয়েছে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে, আর ঠিক সে কারণেই কুটির শিল্পকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে অন্যান্য বৃহৎ শিল্পও মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ভুটানে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভুটান সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলে। কারও সাথে সাতে পাঁচে নেই এই দেশটি করোনা মহামারী আসবার পর থেকেই একের পর এক চমকের সৃষ্টি করে যাচ্ছে বিশ্ব দরবারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশ ভারতের সাথে সীমান্ত একদম মাখো মাখো হয়ে থাকা সত্ত্বেও ভুটানে করোনা আক্রান্ত ও আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার রীতিমতো কম। একেবারে ঈর্ষণীয় সাফল্য যাকে বলে, সেটিই করে দেখিয়েছে ভুটান। গত বছর ভুটানে করোনা ভাইরাস আঘাত হানার পর একেবারে সবকিছুর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় দেশটি। ২০২০ সালে ভুটানে করোনা ভাইরাসে একজনও মৃত্যুবরণ করেনি এবং দেশটির প্রথম মৃত্যু হয়েছে এই বছরের জানুয়ারি মাসে। এমন নয় যে ভুটানে প্রতিদিন কেউ সংক্রমিত হচ্ছে না। হচ্ছে, কিন্তু অপরাপর দেশগুলোর সাথে ভুটানের পার্থক্য আসলে ঠিক কোথায়?

দেশটিতে ৬ মার্চ প্রথমবারের মতো এক মার্কিন পর্যটক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে তৎক্ষণাৎ তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় এবং তার সংস্পর্শে যারা এসেছিলো সকলকে খুঁজে বের করে কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়। এর মাধ্যমে আমরা ভুটানের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের পরিচয় পাই। জায়গার অপ্রতুলতা থাকা সত্ত্বেও করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য দেশটি গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ১২০টি কোয়ারান্টাইন কক্ষের ব্যবস্থা করে ফেলে। যারা ভুটানের বাইরে থেকে এসেছিল, তাদেরকে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইনে পাঠানো হয়েছিল। পাঠক হয়ত একটু চমকে ভাবতে পারেন, এমন সময়ানুবর্তী সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পেরেছে দেশটি? আসলে ভুটানের রাজা নিজেও একজন ডাক্তার। সরেজমিনে তিনি দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন।

প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়লে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয় এবং জনসমাগম নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য বিষয়ে সতর্কতার জন্যও ভুটানের রাজা নানা বিধিনিষেধ জারি করেন। এমনকি গরীব মানুষের জন্য ঘরে বসেই খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্যই তখন বলেছিলাম ভুটান হচ্ছে একটি মিনিমালিস্ট দেশ। অধিক সম্পদ ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকলেও যে প্রাপ্য সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায়, ভুটান হচ্ছে তার সর্বোতকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে পাঠকদের আরেকটি কথা জানিয়ে রাখি। ভুটানে চিকিৎসকের সংখ্যা বর্তমানে ৩০০ বা তারকিছু বেশি। হাজারের কোটা এখনও পেরোয়নি।

করোনা মহামারির কারণে মৃত্যু ও সংক্রমণের কারণে হিমশিম খাচ্ছে গোটা বিশ্ব। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা আরও নাজুক, ঠিক সেই সময়ে দেশের মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৯০ শতাংশকে টিকা দিয়েছে ছোট্ট দেশ ভুটান। ফলে একে একটি ‘অনন্য কীর্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ। 

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ জুলাই করোনাভাইরাসের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু করে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৯০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের টিকার কোর্স শেষ করেছে ভুটান, ফলে একে ‘অনন্য কীর্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইউনিসেফ।

কীভাবে তা সম্ভব করতে পেরেছে ছোট্ট এই দেশটি?

প্রতিবেদনে পাই চমৎকার এক বুদ্ধিমত্তার সামগ্রিক নিদর্শন। ২০ জুলাই টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরু হলেও এর প্রস্তুতি অন্তত কয়েক মাস আগে থেকেই নেয়া হচ্ছিল। অর্থাৎ, হুট করেই কাজে নেমে পড়েনি ভুটান। চারদিক খেয়াল করেছে, নিজেদের সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে পরিকল্পনা করেছে, এরপর বাস্তবায়ন করেছে। বিশ্বের অনেক বড় বড় রাষ্ট্রই ভুটানের কাছ থেকে এই শিক্ষা নিতে পারে।

ভুটান টিকা দেবার প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি এর প্রচারণাও শুরু করেছিল জোরেশোরে। ভুটানের অনেক মানুষের পেশাই পশুচারণ। হিমালয়ের পাদদেশে অনেকের বসবাস। এসব অঞ্চলে টিকা নিয়ে কীভাবে যাওয়া যাবে, তা ছিল একটি অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন চ্যালেঞ্জকেই হেলিকপ্টারের সাহায্যে সহজ করে ফেলেছে ভুটান। টিকা পরিবহনের সময় কোল্ড চেইনের ব্যবস্থাও করেছে। তাছাড়া যুবা এবং স্বেচ্ছাসেবীদেরও কাজে লাগাতে পেরেছে দেশটি দারুণভাবে। এই স্বেচ্ছাসেবীরা পায়ে হেঁটেই ঘরে ঘরে দিয়ে এসেছেন টিকা।

দেশটিতে টিকা পাওয়ার যোগ্য ৫ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের মধ্যে ৪ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষকেই গত বুধবার পর্যন্ত টিকাদান প্রক্রিয়ার আওতায় আনা গিয়েছে। মহামারির মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি।

রাজধানী থিম্পু থেকে উইল পার্কস বলেন, বিশ্বটা যেন এমন হয়যাতে উদ্বৃত্ত টিকা গরীব কিংবা কম টিকা রয়েছে, এমন দেশগুলোতে পাঠানো হয়। ভুটানে চিকিৎসক কম, নার্সের সংখ্যাও কম। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করবার মাধ্যমে দেশটি তার জনগণকে বাঁচাতে পেরেছে। সেখানে বিশাল বিশাল অট্টালিকা নেই, উন্নয়নের জোয়ার নেই, বেশি বাজেটও থাকে না। সম্পদের জন্য এখনও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। তবে সে দেশটির মাঝে যা রয়েছে, তা হলো পরামর্শদাতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করার স্পৃহা। দেশের জনগণও সরকারকে সাহায্য করে গিয়েছে অকুণ্ঠভাবে। মিলেমিশেই তাই করোনা টিকাদান কর্মসূচী পালন করা গিয়েছে।

পাশের দেশ থেকে যদি আমরা এখনও শিক্ষা নিতে না পারি, তাহলে কবে?




Social Media

মন্তব্য করুন:





সর্বশেষ খবর





সর্বাধিক পঠিত



এই বিভাগের আরও খবর

আরও সংবাদ